শীত মৌসুমে রসের পিঠা। আবহমান কাল থেকেই যশোরের রয়েছে এর অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আত্মীয়-স্বজনেরা এ সময়ে তাকিয়ে থাকেন কবে পিঠা আসবে, এর স্বাদ গ্রহণ করবো।
শৈশবে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে একটি কবিতার কথা এখনা মনে পড়ে- ‘যশোর জেলায় আছে রে ভাই, পাটালী গুড়, খেজুর গাছ, ফরিদপুরের কি মজাদার, পদ্মা নদীর ইলিশ মাছ।’
এবার পিঠা খাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। ইতোপূর্বে এ ধারণা আমার ছিল না। সাধারণ মানুষের পিঠা খাওয়ার স্বাদ এখন নাগালের বাইরে।
কর্ম সুবাদে বর্তমানে আমার তিন মেয়ে জামাই, নাতি-নাতনিরা ঢাকার বাসিন্দা। এবার তারা পিঠা খেতে চেয়েছিল। ঢাকায় পিঠা খাওয়া বা পাওয়া যায়, কিন্তু মেয়েদের বাপের বাড়ির পিঠা, বিশেষ করে যশোরের পিঠার প্রতি রয়েছে বিশেষ দুর্বলতা। তাদের আবদার পূরণে পিঠার উপকরণ জোগাতে হিমশিম খাওয়ার জোগাড়। তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে পিঠা খেতে পারবে?
আশির দশকে সপরিবারে বসবাস করতাম যশোর শহরের ঘোপ সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্টাফ কোয়ার্টারে। শীতের সকালে শহরের আশে পাশে গ্রাম থেকে ছিকে-বাক কাঁধে নিয়ে রস বিক্রি করতে আসত চাষিরা। প্রতি ঠিলে রস পাওয়া যেত দশ-বারো টাকায়। আর দুধ কিনতাম পনেরো-ষোল টাকা সের। পাটালী কিনেছি প্রতি সের পঁচিশ-ত্রিশ টাকায়। তখন ১নং-২নং বলে কোনো পাটালী ছিল না, সবই ছিল ১নং।
পিঠা খেতে প্রায় পঞ্চাশ বছর পর এসে এখন দুই ঠিলে রস কিনেছি ৭০০/, দুধ চার কেজি ২৮০/-, চালের গুড়া তৈরি করতে আলো-চাল পাঁচ কেজি ৩৫০/-, পিঠা স্বাদ বাড়াতে দুই কেজি পাটালী ৬০০/-। ভাগ্যবশত বাড়ির নারিকেল গাছে দুটি ঝুনা নারিকেল পাওয়া গেছে বলে কিছুটা রক্ষা।
মাটির ছাঁচে তৈরি পিঠা একটি বড় টিনের হাঁড়িতে রাখা হয়। ভারী ওজনের সেই হাঁড়ি বহন করা আমার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেটি বহনের জন্যে সঙ্গী হিসেবে শক্তিশালী একজন প্রতিবেশীকে পাওয়া যায়। বাড়ি থেকে যশোর স্টেশন পর্যন্ত ইজি বাইক ভাড়া ২০০/-, যশোর থেকে ঢাকা-কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত দুজনের ট্রেনভাড়া ১,১০০/-, কমলাপুর স্টেশন থেকে ঢাকা মিরপুর পর্যন্ত সিএনজি ভাড়া ৫০০/- সর্বমোট ৩,৭৩০/-। এখন টাকার অংকে হিসাব করলে প্রতি পিস পিঠার মূল্য যাই পড়ুক, সেটি বড় কথা নয়। তবু মেয়ে জামাই, নাতি-নাতনিরা পিঠা খেতে চেয়েছে সেটি আমার কাছে বড় আনন্দের কথা।
গ্রামে এখন ঢেঁকির প্রচলন নেই। যশোরের এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে গ্রামের বাড়িতে ঢেঁকিঘর নির্মাণ করেছি। শীত মৌসুমে মহিলারা পালাক্রমে ঢেঁকি ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত আলো-চাল, কুমড়া বড়ির ডাল ইত্যাদি কোটায় ব্যস্ত থাকেন। তাদের বসার জন্যে আসন, বৈদ্যুতিক আলো, টয়লেট ব্যবস্থা করেছি, বাচ্চাদের খেলাধূলার জন্য আরও কিছু ভবিষ্যত কর্ম-পরিকল্পনা রয়েছে।
লেখক: প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও উন্নয়ন কর্মী
প্রকাশক ও সম্পাদক : মো. জাকির হোসেন
dailyalokitochandpur@gmail.com, +8801613090707
Copyright © 2025 Dailyalokitochandpur. All rights reserved.